বাবর আলী

বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোর


১৭ আগস্ট ২০২৩ ০৬:৩৭



ভ্রমণে সতর্কতা

বাবর আলী, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর

১৭ আগস্ট ২০২৩ ০৬:৩৭

ভ্রমণে সতর্কতা

ছবি : বাবর আলী

শাস্ত্রে আছে ‘স্বান্তঃ সুখায়’। সোজা বাংলায় বলতে গেলে নিজের চিত্তের আনন্দের সন্ধানে নিজের মাঝে মজে থাকা। এই পুলক লাভের বাসনা থেকেই আমরা ঘর ছেড়ে বেরোই। ছকে বাঁধা জীবন থেকে কিছু সময়ের ফুরসত লাভ। বাড়ি ছেড়ে বেরোনো মানেই ঘরের ‘কম্ফোরট জোন’ এর চেনা খোলস ছেড়ে আসা। এই পথ চলতে গিয়েই এমন কিছু পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, যা নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা অনেক ক্ষেত্রেই আমাদের হাতে থাকে না। তারপরও কিছু সতর্কতা মেনে চললে অধিকাংশ বিপদ উতরে যাওয়া সম্ভব।

আমাদের ভূখণ্ডে বৈচিত্র্যের অভাব নেই। পাহাড়, টিলা, বন-জঙ্গল, বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য, সমুদ্র, দ্বীপ, নদী, হ্রদ, ঝরনা, ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরাকীর্তি, হাওড়সহ বেড়ানোর জন্য অসংখ্য গন্তব্য। আবার গন্তব্যভেদে বেড়ানোর মৌসুমও ভিন্ন। তবে বর্ষা মৌসুমে যে গন্তব্যেই যাওয়া হোক না কেন, দরকার খানিকটা বাড়তি সজাগতা।

আমাদের দেশের পাহাড়ের বিপদ অন্যান্য দেশেরগুলোর মতো নয়। বাড়ির পাশের হিমালয়ে অভিযানে গেলে সবচেয়ে বড়ো প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায় তুষারধস, হিমবাহের মাঝের ফাটল আর উপর থেকে আচমকা গড়িয়ে পড়া পাথর। সঙ্গে আবহাওয়ার ক্ষণে ক্ষণে রুপ বদলানো তো আছেই। আমাদের দেশের পাহাড়ে বিপদ অন্য। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ে পদযাত্রীদের ভ্রমণ পরবর্তী সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছে খুব সম্ভবত ম্যালেরিয়া। মশাবাহিত এই রোগ আজ অবধি কেড়ে নিয়েছে অনেকের প্রাণ কিংবা ভুগিয়েছে লম্বা সময় ধরে। বর্ষায় পার্বত্য অঞ্চলে ভ্রমণের আগে থেকেই ম্যালেরিয়া প্রতিরোধী ওষুধ ডক্সিসাইক্লিন সেবন করলে এই রোগের ঝুঁকি এড়ানো সম্ভব। তবে মুশকিল হলো এটি ভ্রমণের পরেও দীর্ঘ সময় ধরে খেতে হয়। যারা লম্বা সময় ধরে ওষুধ সেবনে স্বচ্ছন্দ নন, তারা মশা এবং কীটপতঙ্গ বিতাড়ক ক্রিম সারা গায়ে মেখে নিতে পারেন। এক্ষেত্রে মনে রাখতে হবে, শরীরের কাটা অংশে এই ক্রিম লাগানো যায় না। এছাড়া একবার শরীরে মাখলে এই ক্রিম আট ঘন্টা অবধি সুরক্ষা দেয়। সেক্ষেত্রে দিনে তিনবার অবধি এই ক্রিম ব্যবহার করার প্রয়োজন হতে পারে।    

বর্ষায় হঠাৎ নামা তুমুল বৃষ্টি কিংবা টানা বর্ষণে হড়কা বান ডেকে নিয়ে আসতে পারে সমূহ বিপদ। আচমকা ধেয়ে আসা এই জলস্রোত তার চলার পথের সবকিছুকে ভাসিয়ে ভাটিতে নিয়ে যায়। হড়কা বানের সময়ে ছোটো ঝিরি খুবই অনিরাপদ জায়গা। আগ থেকে আঁচ করা গেলে ছোটো ঝিরি এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। কিংবা দুর্ঘটনাবশত হড়কা বানে পড়ে গেলে পাহাড়ের উঁচু এবং অপেক্ষাকৃত নিরাপদ অংশে আশ্রয় নিতে হবে।    

পাহাড়ে পদযাত্রীরা অধিকাংশ সময়েই দুর্ঘটনায় পড়ে উতরাইয়ের সময়। পাহাড় কিংবা ঝরনার গা বেয়ে উঠার চেয়ে নামা অধিকাংশ ক্ষেত্রে বিপজ্জনক। চড়াইয়ে উঠার সময় আমাদের শরীরের ভরকেন্দ্র থাকে দুই পায়ের মাঝে। নামার সময়ে আমাদের শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে থাকে বিধায় শরীরের ভরকেন্দ্রও সামনের দিকে থাকে। তাই পা হড়কানোর সম্ভাবনা স্বভাবতই বেশি থাকে। এছাড়াও নামার সময়ে আমরা উঠার সময়ের চেয়ে কিছুটা হলেও ক্লান্ত থাকি। তাই ক্লান্তির সাথে ক্ষণিকের মনোসংযোগের অভাবও ঘটাতে পারে বড়ো কোন দুর্ঘটনা। উতরাইয়ের সময়ে অতিরিক্ত সতর্কতা তাই কাম্য। সুরক্ষার অংশ হিসেবে ভালো গ্রিপের জুতা পরিধান করা বাঞ্চনীয়।

বর্ষায় ট্রেক করতে গেলে কাটা-ছেঁড়া, হাত-পায়ে আঘাত পাওয়া, পা মচকে যাওয়া কিংবা উচ্চতা থেকে পতনের ঘটনায় ফার্স্ট এইড জানাটা জরুরি। বেসিক ফার্স্ট এইড জানা কারো উপস্থিতি নিঃসন্দেহে দলের বাড়তি শক্তি। ফার্স্ট এইড প্রদানকারীর মূল লক্ষ্যই থাকে যেন আহত ব্যক্তির শারীরিক অবস্থার অবনতি না হয়। তবে খেয়াল রাখতে হবে, কাউকে সাহায্য করতে গিয়ে সাহায্য প্রদানকারী যাতে ভিক্টিমে পরিণত না হয়ে যান। সেক্ষেত্রে দলে আহত লোকের সংখ্যা বাড়বে আরেকজন। ট্রেকিং-এ পায়েখড়ির সাথে সাথেই যাতে ফার্স্ট এইড-এ আমাদের হাতেখড়ি হওয়াটাও প্রয়োজন।   

বর্ষায় পার্বত্য অঞ্চল ভ্রমণে পূর্ণ যৌবনা নদী, খাল কিংবা ঝিরি পেরোতে হয় অনেককেই। ভালো সাঁতার না জানাদের অতি অবশ্যই সাথে লাইফ জ্যাকেট রাখা উচিত। লাইফ জ্যাকেটের সাথে অপরিহার্য আর একটা উপাদান হলো দড়ি। নদীপথ, হাওড় কিংবা দ্বীপ ভ্রমণেও আবশ্যকীয় পরিধেয় এই লাইফ জ্যাকেট। সমুদ্রসৈকতে নামার আগে লাল পতাকার ঝান্ডা নেমেছে কি না দেখে নিতে হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিকূল হলে স্থানীয়দের বিধিনিষেধ শোনাটা দরকারি।

এ তো গেল তত্ত্বের শুকনো মরু। এত সাবধানতার পরও প্রকৃতির প্রতিকূলতা কিংবা নির্দিষ্ট জায়গার প্রতিবেশ কিংবা পরিস্থিতি ছাপিয়ে যায় সকল সতর্কতাকেও। চলার পথে হয়তো এমন পরিস্থিতি আসতে পারে, যখন মাথা ঠান্ডা রেখে সবচেয়ে কার্যকরী সমাধানটার উপর আস্থা রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ হবে। দৃষ্টি থাকুক সজাগ, ভ্রমণ হোক নিরাপদ। 

জেডএস/