জান্নাতুল ফেরদৌস, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
২১ জুলাই ২০২২ ০৬:৩৯
ছবি: হিন্দুস্তান টাইমস
সিগারেট যে আসক্তি-সৃষ্টিকারী তা নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। কিন্তু এই আসক্তির পরিমাণ নিয়ে
নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। নয়া এক গবেষণায় বলা হচ্ছে, হেরোইন ও কোকেনের মতো আসক্তি-সৃষ্টি
করতে পারে সিগারেট। কিন্তু কিসের জন্য মানুষ এত সিগারেট খেতে চায় কিংবা কেনইবা মানুষ
এর ক্ষতি বা পরিণতি সম্পর্কে জেনেও ধূমপান সহজে বন্ধ করতে পারে না?
যুক্তরাষ্ট্রের
খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসনের (এফডিএ) ভাষ্যে, তামাক মানুষের মস্তিস্কের কাজ করার পদ্ধতিকেই
বদলে ফেলে, যার কারণে এটি গ্রহণে আরও উৎসাহী হয় মানুষ।
টরন্টো
বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের আসক্তিবিষয়ক মনোরোগবিদ্যার প্রধান বার্নার্ড
লে ফল এক ইমেলে ‘লাইভ সায়েন্স’কে বলেছেন, প্রাথমিকভাবে আসক্তি বলতে কোনো কিছু ব্যবহারের
ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং পরিণতি জানার পরেও সেটার ব্যবহার অব্যাহত রাখাকে বোঝায়।
তিনি
বলেন, ‘একবার কোনোকিছুর প্রতি আসক্তি তৈরি হয়ে গেলে ভুক্তভোগী একটি নির্দিষ্ট সময়ের
জন্য এটা ব্যবহার না করার কারণে তীব্র আকাঙ্ক্ষা অনুভব করবে। তামাক আসক্তির কারণ এতে
নিকোটিন রয়েছে। আর নিকোটিন উচ্চ আসক্তির একটি সাইকোঅ্যাকটিভ (চিত্তপ্রভাবকারী) পদার্থ।’
সাইকোঅ্যাকটিভ
এমন একটি পদার্থ যা মস্তিষ্কের কাজকে প্রভাবিত করে। যুক্তরাষ্টের জাতীয় ক্যান্সার
ইনস্টিটিউট (এনসিআই) বলছে, ‘এটি মেজাজ, সচেতনতা, চিন্তাভাবনা, অনুভূতি বা আচরণে পরিবর্তন
ঘটায়।’ সাইকোঅ্যাকটিভ পদার্থের অন্যান্য উদাহরণের মধ্যে রয়েছে এলএসডি, অ্যালকোহল
ও ক্যাফেইন।
মিশিগানের
ওয়েন স্টেট ইউনিভার্সিটির একজন ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ডেভিড লেজারউড ইমেলে ‘লাইভ
সায়েন্স’কে বলেন, ধূমপান বা অন্যভাবে নিকোটিন ফুসফুসে নেওয়া হলে এটা বিশেষভাবে আসক্তির
সৃষ্টি করে। কারণ নিকোটিন নেওয়ায় তড়িৎ গতিতে এক ধরনের উদ্দীপনা কাজ করে।
লেজারউড
এও জানাচ্ছেন, সিগারেট ধরানোর পরপরই যে উদ্দীপনা তৈরি হয়, তা শেষ হতেও খুব বেশি সময়
লাগে না। ফলে আগের উদ্দীপনা নিতে বারবার ধূমপানের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।
তামাক
সেবনের কারণে মানুষের রক্তপ্রবাহে নিকোটিনের মাত্রা বেড়ে যায় এবং তা মস্তিষ্কে প্রবেশ
করে। যুক্তরাষ্ট্রের স্বাস্থ্যবিষয়ক অলাভজনক প্রতিষ্ঠান মায়ো ক্লিনিক জানাচ্ছে, নিকোটিনের
কারণে মস্তিষ্কে এক ধরনের সুখানুভূতি কাজ করে। ফলে পরের সিগারেট খাওয়ার আগ পর্যন্ত
তার জন্য তীব্র বাসনা কাজ করে।
মায়ো
ক্লিনিকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, দীর্ঘস্থায়ী ধূমপান মস্তিষ্কে নিকোটিন রিসেপ্টরের
সংখ্যা বাড়ায়। ফলে অধূমপায়ীর তুলনায় ধূমপায়ীর এ রিসেপ্টরগু সংখ্যা বিলিয়ন পরিমাণ
বেশি হয়ে থাকে।
লেজারউড
বলেন, কেউ যদি বছরের পর বছর ধূমপান করে, তবে তাদের মস্তিষ্ক নিকোটিন গ্রহণে অভ্যস্ত
হয়ে যাবে। তখন যেকোনো কাজ ভালভাবে করার জন্য তাদের নিকোটিনের প্রয়োজন হবে। যখন ধূমপানে
আসক্ত ব্যক্তি ধূমপান করে না, এমন অবস্থার শুরুতে শারীরিক বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে
পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ক্যান্সার ইন্সটিটিউটের ভাষ্য, তখন মনোযোগী না হতে পারা,
অনিদ্রা, বিষণ্নতা ও ক্ষুধামন্দার মতো সমস্যা দেখা দেয়।
আর
এফডিএ বলছে, যারা শিশু বা কিশোর বয়সে তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার শুরু করে, তাদের ধূমপান
ত্যাগ বেশ কঠিন হয়ে যায়। কারণ নিকোটিনের প্রভাব তাদের মস্তিষ্কের বিকাশকে ব্যাহত করে।
২০১২
সালের কোল্ড স্প্রিং হারবার পার্সপেক্টিভস ইন মেডিসিনে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুসারে,
প্রাপ্তবয়স্কদের তুলনায় কিশোর-কিশোরীরা ধূমপানে বেশি আসক্ত হয়। তারা ধূমপানের ক্ষতির
বিষয়ে যেমন সচেতন থাকে না, তেমনই সমবয়সীদের মাধ্যমে সহজেই প্রভাবিত হয়।
ধূমপান
ছাড়ার উপকারিতার উপাত্ত তুলে ধরতে গিয়ে মায়ো ক্লিনিক বলছে, সিগারেট খেলে ২০ মিনিটের
মধ্যে হৃদস্পন্দন কমে যায়, রক্তে বিষাক্ত গ্যাস কার্বন মনোক্সাইডের মাত্রা স্বাভাবিক
অবস্থায় ফিরে আসতে সময় লাগে ১২ ঘণ্টা। আর ধূমপান ত্যাগের তিন মাসের মধ্যে ফুসফুসের
কার্যকারিতা ও সঞ্চালন উন্নত হয় এবং এক বছর পরে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অর্ধেক কমে
যায়। সূত্র: লাইভ সাইন্স
জেডএস/আরআর