নিজস্ব প্রতিবেদক, বেঙ্গলনিউজ টোয়েন্টিফোর
২৬ ডিসেম্বর ২০২৪ ১১:৩৯
ছবি: সংগৃহীত
বহু মতাদর্শ এবং রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের নিয়ে গঠিত বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিভক্তি প্রকট হচ্ছে। এ বিভক্তির বড় কারণ ক্ষমতার ভাগবাটোয়ারা। এছাড়াও রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধ, ভবিষ্যত পথ চলার রূপরেখা নিয়ে মতপার্থক্য, রাজনৈতিক সংগঠন থেকে আসা সমন্বয়কদের সঙ্গে অরাজনৈতিক শিক্ষার্থী সমন্বয়কদের মতবিরোধের মতো কারণগুলোর জন্য বিভাজন বাড়ছে। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একাধিক সূত্র বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোরকে এমন তথ্য জানিয়েছে।
একাধিক সূত্রমতে,
ক্ষমতার সুবিধা ভোগ করা নিয়ে বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের মধ্যে বড় দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছে। ১৫৮ জন সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়কের
মধ্যে ৬-৭ জনের হাতে যাবতীয় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত
হয়ে গেছে। সমন্বয়ক থেকে অন্তবর্তী সরকারের উপদেষ্টা হয়ে যাওয়া আসিফ মাহমুদ ভূঁইয়া
সজীব, নাহিদ ইসলাম ও মাস্টারমাইন্ড খ্যাতি পাওয়া মাহফুজ আলম, সারজিস আলম, হাসনাত আব্দুল্লাহ,
আরিফ সোহেল ও আবদুল হান্নান মাসউদ এই ৭জনই মূলত যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এদেরকে
ঘিরে আরও কয়েকজন সমন্বয়কের একটি বলয় গড়ে উঠেছে। এই বলয়ের বাইরে থাকা সমন্বয়করা সংগঠনে
একেবারেই গুরুত্বহীন হয়ে পড়েছেন। বর্তমানে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক
হলেন হাসনাত আব্দুল্লাহ, সদস্য সচিব আরিফ সোহেল এবং মূখ্য সংগঠক আবদুল হান্নান মাসউদ।
বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের একজন সমন্বয়ক বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোরকে জানান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
বাইরের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয়কদের দূরত্ব তৈরি হয়েছে। শুধু শিবির নিয়ন্ত্রিত
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ও ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সমন্বয়কদের
সঙ্গে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সুসম্পর্ক রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর
বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভূক্ত সাত কলেজ থেকে
কোনো সমন্বয়ককেই সরকার কিংবা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নীতি নির্ধারক অবস্থানে
রাখা হয়নি। ঢাকা কলেজ, ইডেন কলেজ, তিতুমীর কলেজ, মীরপুর বাংলা কলেজ, কবি নজরুল কলেজের
মতো গুরুত্বপূর্ণ কলেজগুলো থেকে কেউই মূল্যায়ন পাননি। আন্দোলনে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর
বড় ভূমিকা থাকলেও তাদেরকে মূল্যায়ন করা হয়নি। এসব কারনে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে
কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। কিছুদিন আগে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন
সমন্বয়ককে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে তার বিরোধীপক্ষ।
বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের একাধিক সূত্র জানায়, তিন
উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ, নাহিদ ইসলাম ও মাহফুজ আলম এবং তিন সমন্বয়ক সারজিস আলম, হাসনাত
আব্দুল্লাহ, আব্দুল হান্নান মাসউদ, আরিফ সোহেলসহ কয়েকজন ক্ষমতায় থাকার যাবতীয় সুযোগ
সুবিধা ভোগ করছেন। তারা দামী গাড়ি, ফোন, জামাকাপড় ব্যবহারসহ বিলাসী জীবনযাপন করছেন।
এতে সংগঠনের অভ্যন্তরে দুই ধরনের সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে।
প্রথমত,
যারা শেখ হাসিনা সরকারের নানা অনিয়মের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর আদর্শিক জায়গা থেকে বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনে এসেছিলেন তারা ক্ষুব্ধ হয়েছেন। তারা সমন্বয়কদের ভোগবিলাসে মেতে উঠাকে
অপছন্দ করে সংগঠন থেকে দূরে সরে গেছেন। দ্বিতীয়ত, যারা কিছু পাবার আশায় সংগঠনের নেতৃত্বে
যুক্ত হয়েছিলেন তারা ক্ষমতার ভাগ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েছেন। একদিকে আওয়ামী লীগের ফিরে
আসার ভয়, অন্যদিকে ক্ষমতার ভাগ না পাওয়া এই দুই চাপে অনেকে সংগঠন থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
একাধিক সূত্রমতে,
আগামীতে বিএনপি ক্ষমতায় যেতে পারে এমন আশা থেকে সারা দেশে সমন্বয়কদের অনেকে বিএনপির
সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন। এ নিয়েও সংগঠনের অভ্যন্তরে বিরোধ দেখা দিয়েছে।
রাজনৈতিক
দল গঠনের প্রশ্নেও অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে যাচ্ছেন। তারা মনে করে করছেন, একটি নির্দিষ্ট
দাবিকে সামনে রেখে এই আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই দাবি যেহেতু পূরণ হয়ে গেছে ফলে এই প্ল্যাটফর্মের
সঙ্গে আর যুক্ত থাকার প্রয়োজন নেই। কারণ কিছু সমন্বয়ক এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করছে
ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য।
একাধিক সূত্র
জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিবির ও হিজবুত তাহরীরের মতো জঙ্গি সংগঠনগুলোর
নেতাকর্মীরা নেতৃত্ব দিয়েছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে সমন্বয়ক হিসেবে
নামমাত্র যোগ করা হয়েছিল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পাবার লক্ষ্যে। গত ৫ আগস্ট শেখ
হাসিনা সরকারের পতনের পর যাবতীয় সিদ্ধান্ত নিয়েছেন ৬-৭ জন সমন্বয়ক। এরা মুহাম্মদ ইউনূস
ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নিয়ে তা বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের উপরে চাপিয়ে দিত।
সম্প্রতি
দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র শিবিরের সভাপতি সাদিক কায়েমের একটি
লেখা প্রকাশ হয়। সেখানে সাদিক জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের নেপথ্য শক্তি হিসেবে শিবিরের
নানা ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের অনেক নেতাকর্মী।
ফেসবুকে
পোস্ট দিয়ে ক্ষোভ ঝাড়েন গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের এক শিক্ষার্থী নোমান
আহমেদ চৌধুরী। তিনি লেখেন, 'নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ, মাহফুজ আলম, আবু বকর মজুমদার,
আব্দুল কাদের আপনাদের ভরসায় আর আপনাদেরকে বিশ্বাস করে নেতৃত্ব মেনে নিয়ে আন্দোলনে গিয়েছিলাম
ভাই। প্রত্যেকটা দিন জীবন বাজি রেখে মারা যেতে পারি ভেবেই রাস্তায় নেমেছি।কিন্তু শিবিরের
ঢাবি সভাপতির লেখায় এটা সুস্পষ্ট যে আপনারা ছিলেন শিবিরের হাতের পুতুল মাত্র (তাদের
দাবী অনুযায়ী)। আমি এই আর্টিকেলের প্রত্যেকটা লাইনের জবাব চাই আপনাদের কাছে। আই রিপিট
প্রত্যেকটা লাইন। আমি জানতে চাই প্রতারণা তারা করছে নাকি আপনারা আমাদের সাথে করেছেন?'
নোমান আহমেদ
চৌধুরী আরও লেখেন, 'জবাবটা গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এইটা সাধারণ একটা ফেইসবুক পোস্ট না।
জিনিসটা পত্রিকার প্রিন্টে গেছে। আর্কাইভে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ডকুমেন্ট হিসেবে কিয়ামত
পর্যন্ত থেকে যাবে। আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম এসবই জানবে আর বিশ্বাস করা শুরু করবে। যদি
সাদিক কায়েমের বক্তব্য মিথা হয়, তাহলে জিনিসটা প্রিন্টে পাঠানোর জন্য মাহমুদুর রহমানকে
কেন শোকজ করে আমার দেশের লাইসেন্স বাতিল করা হবে না আমি এটাও জানতে চাই। যদি জবাব দিতে
না পারেন, আমি ধরে নিব আপনারা প্রতারণা করেছেন পুরো জাতির সাথে।'
বাংলাদেশের
সংবিধান নতুন করে লেখা, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ দাবি, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে অসম্মান
করার নীতি নেওয়ার বিষয়টি অনেক সমন্বয়ক ও আন্দোলনকারী ভালভাবে নেননি। ধীরে ধীরে বিষয়গুলো
সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে স্পষ্ট হতে শুরু করে। তারা এসব বিষয়ে নির্দলীয় সমন্বয়কদের
উপরে চাপ তৈরি করেন। ফলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে থেকে নির্দলীয় যারা সমন্বয়ক হয়েছিলেন
তারা বেশির ভাগই নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছেন।
গত ১৫ নভেম্বর
রাজধানীর বাংলামোটরে রূপায়ণ টাওয়ারস্থ সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১৫৮ জন সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়কের অংশ নেওয়ার
কথা থাকলেও উপস্থিত ছিলেন ৮৮ জন। প্রায় অর্ধেক সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়ক সভায় উপস্থিত
হননি। সভায় আলোচনার মধ্যে দিয়ে সংগঠনের অভ্যন্তরীণ সংকট এবং ভাবমূর্তির উন্নয়নে করণীয়
বিষয়ে আলোচনা ও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
সেদিন বৈঠক
শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন আবদুল হান্নান মাসউদ। সমন্বয়কদের মধ্যে যারা রাষ্ট্র চালাচ্ছেন তাদের সঙ্গে সমন্বয়হীনতার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা
রাষ্ট্র চালাচ্ছেন, তাদের মধ্যে সমন্বয়হীনতা থাকলে এটা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। সরকারের
বাইরের অংশের সঙ্গে কী হচ্ছে, সেটা আলাপের বিষয় নয়। তাঁদের মধ্যে যে সমন্বয়হীনতা আছে,
তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সমন্বয়ক
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকে বিতর্কিত করা হচ্ছে। আর এটাকে
বিতর্কিত করলে গণ-অভ্যুত্থানের যে লেজিটিম্যাসি, সেটাকেও বিতর্কিত করা হবে। আমরা ক্রিটিক্যাল
হচ্ছি। ক্রিটিক্যাল হলেই প্রগেস আসে।'
একাধিক সূত্র
জানায়, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কাজ কী, তা নিয়ে সভায় প্রশ্ন উঠে। সরকারের উপদেষ্টা
মনোনীত করার প্রক্রিয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমন্বয়কদের ভূমিকা কী সে বিষয়ে জবাবদিহিতা
চান একাধিক সমন্বয়ক।
সভায় একজন
সমন্বয়ক বলেন, সবকিছু স্পষ্ট করেন। নাহলে আমরা আবার তারা শিক্ষার্থী হয়ে যাই। আগে
যেমন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিপক্ষে রাস্তায় দাঁড়াতাম, সেভাবে রাস্তায় থাকি। না হলে
জনগণ এসে গালি দিচ্ছে আমাদের।
সভায় বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের সহ-সমন্বয়ক মো. মোবাশ্বের উপদেষ্টা পদে থাকা সমন্বয়কদের সমালোচনা
করেন। তিনি বলেন, 'কোনো বুঝ নিতে আমরা বৈঠকে আসিনি। আমরা সুস্পষ্ট উত্তর নিতে এসেছি।
একটা বুঝ দিলেই চলে যাব—এখন
আর সেই সময় নেই। আমাদেরকে এখন ভুয়া ভুয়া স্লোগান শুনতে হচ্ছে। এটা আমাদের ব্যানারের
জন্য দুঃখজনক। এই সভার বক্তব্য যেন উপদেষ্টা নাহিদ ও আসিফের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়। আমরা
আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আন্দোলন করি আর উপদেষ্টা পরিষদে পদ পায় আওয়ামী লীগের লোকেরা।
আওয়ামী লীগকে
পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়ার অভিযোগ সম্প্রতি আরো জোরালো হয়েছে। বিশেষ করে সারা দেশে স্থানীয়
সরকারের জনপ্রতিনিধি ছিলেন এমন আওয়ামী লীগ নেতাদেরকে দলে ভিড়ানোর চেষ্টা চলছে। আন্দোলনে
অংশ নেওয়া ছাত্রদের পক্ষ থেকে যে দল গঠনের আয়োজন চলছে সেখানে আওয়ামী লীগের জনপ্রতিনিধিদের
যুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এ নিয়ে সমন্বয়কদের মধ্যে মতপার্থক্য বেড়ে গেছে। অনেকেই আওয়ামী
লীগের নেতাদের নিয়ে দল গঠনের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।
দেশের
নানা জায়গায় অভ্যন্তরীণ বিরোধ
দেশের বিভিন্ন
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কেন্দ্রীয় সমন্বয়কদের সঙ্গে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মীদের
বিবাদ শুরু হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মারধরের শিকার হয়েছেন একজন সহসমন্বয়ক।
বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় সহসমন্বয়ক মিশু আলি সুহাস গত সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
পাশে রমনা কালী মন্দির এলাকায় তাদেরই সংগঠনের একটি অংশের নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার
হন।
মিশু আলি
সুহাস গণমাধ্যমকে জানান, তিনি রাত সাড়ে সাতটার দিকে রমনা কালী মন্দিরের দিকে যেতে চেয়েছিলেন।
দুইজন শিক্ষার্থী তাকে বাধা দেয়। তিনি ছবি তুলতে গেলে তাকে মারধর করা হয়, ফোন কেড়ে
নেওয়া হয়।
মিশু আলি
সুহাস বলেন, 'আসলে আমি ছবিটা তুলে হয়তো সমালোচনা করতাম। আমরা এখনো যদি সমালোচনা
করতে না পারি তাহলে কিসের গণঅভ্যুত্থান করলাম? আমি গণঅভ্যুত্থানে ফ্রন্ট লাইনে ছিলাম।
স্বাধীন হওয়ার পরে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার জুনিয়রের কাছে চড় খেতে হলো।'
সোমবার
(২৩ ডিসেম্বর) দুপুরে রংপুর প্রেস ক্লাবের সামনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ব্যানারে
এক মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়। এতে নেতৃত্ব দেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের রংপুর জেলা
শাখার যুগ্ম সদস্যসচিব হামিম মুন্তাসির অহন। তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের
রংপুরের কিছু নেতাকর্মী নিজেদের আখের গোছাতে ব্যস্ত। যে সংগঠন মানুষের অধিকার, হক আদায়ের
জন্য কাজ করার কথা ছিল, সেই সংগঠনের কিছু নেতা ঘুরেফিরে স্বৈরাচারের মতো কাজ করে যাচ্ছে।’
গত ১৮ ডিসেম্বর
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যশোর জেলা শাখা কমিটি থেকে পদত্যাগ করেছেন যুগ্ম আহ্বায়ক
ফরিদ হাসান। তিনি বলেন, ‘গুটি কয়েক মানুষের হাত ধরে কোটা প্রথার বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলন
শুরু হয়েছিল, যার মধ্যে আমিও একজন ছিলাম। কিন্তু বর্তমানে কেন্দ্রীয় নেতারা সঠিক
পথে নেই। তারা জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে এবং ব্যক্তি কেন্দ্রিক হয়ে
উঠেছে।’
ফরিদ হাসান
আরও বলেন, 'যশোর জেলা কমিটিতে যারা পদ পেয়েছে তাদের আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা নিয়ে
প্রশ্ন রয়েছে, তাদের উচ্চপদে রাখা হয়েছে যারা কখনো ছাত্র জনতার আন্দোলনের আকাঙ্ক্ষা
মনে পোষণ করে না।'
কেন্দ্রীয়
একজন সমন্বয়কের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে ফরিদ হাসান বলেন, 'একজন কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক
জেলার এক নেতার সঙ্গে খারাপ ভাষায় কথা বলেছেন, যা আন্দোলনের আদর্শের পরিপন্থী। তাই
আমি জনগণের কাতারে দাঁড়িয়ে তার শাস্তি দাবি করছি।'
এর আগে ২৬
নভেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের যশোর জেলা কমিটি অনুমোদন দেন সংগঠনের আহ্বায়ক
হাসনাত আবদুল্লাহ ও সদস্যসচিব আরিফ সোহেল।পরদিন ২৭ নভেম্বর সদ্য ঘোষিত কমিটির আহ্বায়কসহ
অনেকের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ তুলে পদত্যাগ করেন যুগ্ম আহ্বায়ক-১ মাসুম বিল্লাহ।
৩০ নভেম্বর পদত্যাগ করেন আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক সজীব হোসেন।
গত ২ ডিসেম্বর
সিলেট জেলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি গঠন হয়। পরে ৯ ডিসেম্বর সে কমিটি
থেকে পদত্যাগ করেন কমিটির সদস্য জুয়েল আহমেদ। তিনি বলেন, ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটি গঠন করা হয়েছে
জুলাই বিপ্লব ঘিরে। আলাদা প্রেক্ষাপটে ছাত্র নাম দিয়ে সংগঠন করা হয়েছে। কিন্তু কমিটিতে
অনেক অছাত্র রাখা হয়েছে। আবার কমিটির কয়েকজনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। গতানুগতিক
অন্যান্য সংগঠনের মতোই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কমিটিও গঠন করা হয়েছে। আমার কাছে
বিষয়টি সাংঘর্ষিক মনে হয়েছে। এ জন্য কমিটি থেকে সরে দাঁড়িয়েছি।’
বৈষম্যবিরোধী
ছাত্র আন্দোলন সিলেট জেলার সদ্য অনুমোদনকৃত কমিটি থেকে একসঙ্গে ৬ জন পদত্যাগ করেছেন।
আজ মঙ্গলবার (১০ ডিসেম্বর) সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে তাদের আইডি থেকে এ পদত্যাগের
ঘোষণা দেন। এই ছয়জন ছাড়াও ইতিমধ্যে আরো অনেকে পদত্যাগ করেছেন বলে জানা যায়।
এর আগে গত ৫ ডিসেম্বর বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক হাসনাত আব্দুল্লাহ ও সদস্য সচিব আরিফ সোহেল সিলেট জেলা শাখার ২৭২ সদস্য বিশিষ্ট আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেন। পদত্যাগকারী শিক্ষার্থীরা হলেন- আরিফ আহমেদ চৌধুরী, আব্দুল গাফফার আফজল, শেখ উসমান ফারুক, তৌসিফ আহমেদ চৌধুরী, অমিত হাসান, ফাহিমুজ্জান।
গত ২৯ নভেম্বর
কুড়িগ্রাম জেলা কমিটি ঘোষণা করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। সে কমিটির সদস্য মাজু
ইব্রাহীম ১ ডিসেম্বর পদত্যাগের ঘোষণা দেন।
গত গত ০৩
অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন থেকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
(জাবি) শাখার ১৭ জন সমন্বয়ক ও সহ-সমন্বয়ক একযোগে পদত্যাগ করেন। তারা পদত্যাগের পেছনে
মূলত দুইটি কারণ উল্লেখ করেন। তা হলো- বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন জাবির কতিপয় সমন্বয়কের
বিতর্কিত কার্যক্রম ও ব্যক্তিগত প্রভাব খাটিয়ে নিজ স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টা এবং
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সরকারি দলের মতো আচরণ ও গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিটের বিরুদ্ধে
কাজ করা।
পরবর্তীতে
জুলাই-আগস্টে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্ররা মিলে গণঅভ্যুত্থান রক্ষা আন্দোলন নামে
একটি আলাদা প্ল্যাটফর্ম গড়েছেন।
গত ১৯ আগস্ট
পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পাবিপ্রবি) ২৫ জন সমন্বয়ক ও সহসমন্বয়ক
পদত্যাগ করেন।
গত ১৭ই অগাস্ট
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৭ জন সমন্বয়কের মধ্যে ১৪ জনই একসঙ্গে পদত্যাগ করেন। এক বিবৃতিতে
তারা পদত্যাগের কারণ হিসেবে কমিটির বাকি সমন্বয়কদের বিরুদ্ধে স্বেচ্ছাচারিতা, ক্ষমতার
অপব্যবহার, ব্যক্তি স্বার্থে সংগঠনের নাম ব্যবহার, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মারধরসহ নানান
অভিযোগ তোলেন।
বিবৃতিতে
তারা বলেন, “সারা দেশে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন অথবা আন্দোলনের সমন্বয়ক পরিচয়ে
অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। আমাদের জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়েও
এর ব্যতিক্রম নয়। পাঁচই আগস্টের পর থেকে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে, যার দায় এসে পড়েছে
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ওপর।”
গত ১৬ আগস্ট
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে পদত্যাগ করেন ৫
সমন্বয়ক। তারা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মোহাম্মদ রাসেল আহমেদ ও সহসমন্বয়ক খান তালাদ মাহমুদের
বিরুদ্ধে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়া এবং সমন্বয়হীনতার অভিযোগ তোলেন।
আন্দোলনে
বড় ভূমিকা রেখে এখন গুরুত্বহীন নারীরা
গত জুলাই
ও আগস্টে আন্দোলন চলাকালে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকলেও তাদের কাউকে সংগঠনের
নীতি নির্ধারণী অবস্থানে বসানো হয়নি। নারী সমন্বয়কদের কেউই সরকারে স্থান পাননি।
আন্দোলনের
সময়ে সমন্বয়কদের মধ্যে নুসরাত তাবাসসুম ও উমামা ফাতেমা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকায় ছিলেন।
কিন্তু পরবর্তীতে সরকার গঠন বা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে এ দুইজনই
উপেক্ষিত থেকেছেন। বিভিন্ন মহলে সমালোচনা উঠায় কিছুদিন আগে উমামা ফাতেমাকে সংগঠনের
মুখপাত্র করা হয়েছে।
একাধিক সূত্র
জানায়, নারীদের উপেক্ষা করার কারনে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতি তারা বিরূপ
হয়ে গেছেন। সংগঠনের কোনো অনুষ্ঠানে এখন আর আগের মতো সাড়া দিচ্ছেন না নারীরা।
আহতদের
চিকিৎসায় গুরুত্ব না দেওয়ায় অনেকে ক্ষুব্ধ
বৈষম্যবিরোধী
আন্দোলনে অংশ নিয়ে সংর্ঘষে জড়িয়ে অনেকেই মারাত্মক আহত হন। এখনো অনেকে হাসপাতালে
চিকিৎসাধীন। তাদের দাবি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আহতদের সুচিকিৎসায় গুরুত্ব দিচ্ছে
না। এ নিয়ে শেখ হাসিনা সরকারবিরোধী আন্দোলনে সম্পৃক্ত থাকা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার
মানুষ ক্ষুব্ধ। তারা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে সরকার এবং সমন্বয়কদের কঠোর
সমালোচনা করছেন।
চিকিৎসাধীন
নেতাকর্মীদের অভিযোগ, আহতদের সঙ্গে বেইমানি করেছে সরকার। আহতদের চিকিৎসার জন্য সরকারের
পক্ষ থেকে অর্থ দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা এখনো আটকে আছে। চিকিৎসাধীন থেকে
কয়েকজন মারাও গেছেন। দফায় দফায় কর্মসূচি দিয়ে, সরকারের দায়িত্বশীলদের সঙ্গে বৈঠক
করেও কোনো লাভ হয়নি।
তদবির
বাণিজ্যের অভিযোগও উঠছে
গুরুত্বপূর্ণ
একাধিক সমন্বয়ক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে তদবির বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে।
এ নিয়ে সমন্বয়কদের অনেকে ক্ষুব্ধ।
একাধিক সূত্রমতে,
বাংলামোটর মোড়ে রূপায়ন টাওয়ারের নিচে এখন সারাদিন ভীড় জমেই থাকে। এর কারণ হলো, এ
ভবনেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কার্যালয় অবস্থিত। এখানে প্রতিদিন দেশের নানা
প্রান্ত থেকে বিপুল সংখ্যক মানুষ চাকরি, বদলী, ঠিকাদারীসহ নানা কাজের তদবির নিয়ে আসেন।
প্রথমদিকে সমন্বয়করা এসব তদবির এড়িয়ে চললেও এখন এগুলোতে সম্পৃক্ত হচ্ছেন।
কেন্দ্রীয়
একজন সমন্বয়ক বেঙ্গল নিউজ টোয়েন্টিফোরকে জানান, দল গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে সমন্বয়কদের
অনেকের মধ্যে রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্খা দেখা দিয়েছে। তারা নিজ এলাকায় নির্বাচন করবেন এমন
প্রস্তুতি শুরু করেছেন। ফলে তাদের টাকার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। তদবির করে দিয়ে কেউ
কেউ সরাসরি টাকা না নিয়ে নিয়মিত ব্যবহারের জন্য গাড়ি সহযোগিতা, এলাকায় বিতরণের জন্য
ত্রাণসামগ্রী, নিজের ব্যবহারের জন্য দামী ফোন উপহার নিচ্ছেন।
নাম প্রকাশে
অনিচ্ছুক ওই সমন্বয়ক জানান, শুধু সমন্বয়করা নন, একাধিক সমন্বয়কের বাবার বিরুদ্ধেও তদবির
বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে সারজিস আলম ও নাহিদ ইসলামের বাবার বিরুদ্ধে তদবির
বাণিজ্যের জোরালো অভিযোগ রয়েছে।
সম্প্রতি
একটি গণমাধ্যমে ভিডিও সাক্ষাৎকারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের একজন কর্মী অভিযোগ
করেন, উপদেষ্টা নাহিদ ইসলামের বাবা মীরপুরে
একটি অফিস খুলে তদবির বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।
/এসবি